জেএমবি’র সিরিজ বোমা হামলার ১৬ বছর, শেষ হয়নি বিচার

জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সিরিজ বোমা হামলার ১৬ বছর পরও দেশ থেকে জঙ্গি হামলার আতংক যায়নি। মাঝে মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে ভয়ঙ্কর জঙ্গি সদস্য। অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গিরা তাদের প্রচারণা ও দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনলাইনেই তারা জঙ্গি হামলার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তারা হামলার কৌশল রপ্ত করছে। গত ১০ আগষ্ট রাতে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে নব্য জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান জাহিদ হাসান রাজু ওরফে ইসমাঈল হাসান ওরফে ফোরকানসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। তাদের কাছ থেকে বিস্ফোরক পদার্থ, ঢাকনাযুক্ত জিআই পাইপ, রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইস, লোহার বল, সাংগঠনিক কাজে ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল ফোন ও একটি ট্যাব উদ্ধার করে। এর আগে নব্য জেএমবির এই চক্রটি নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে ট্রাফিক পুলিশের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিল।
সম্প্রতি তালেবানদের হাতে আফগানিস্তানের পতন হওয়ার পর দেশে আবারও জঙ্গি আতংক বিরাজ করছে। তালেবানদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে দেশ থেকে অনেক জঙ্গি সদস্য আফগানিস্তানে যেতে পারেন বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে এমনই তথ্য রয়েছে। সিটিটিসি’র তথ্য অনুযায়ি অন্তত ১০ জন জঙ্গি সদস্য আফগানিস্তানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে ২ জন বাংলাদেশী ইতোমধ্যে আফগানিস্তানে চলে গেছেন। হেঁটে আফগানিস্তান যাওয়ার পথে ভারতে দুই জন গ্রেফতার হয়েছেন। আফগানিস্তানে যেতে ইচ্ছুক এমন চার জনকে সিটিটিসি গ্রেফতার করে। বাকি দুই জনের হদিস পায়নি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, র্যাবের অভিযানেই জেএমবির আমির শায়খ আবদুর রহমান, সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ আবদুল আউয়াল, আসাদুল ইসলাম আরিফসহ শীর্ষ জঙ্গি নেতারা গ্রেফতার হয়। তাদের বিচারের মুখোমুখিও করা হয়েছে। তাদের ফাঁসির রায়ও সরকার কার্যকর করেছে। জঙ্গিরা এখন সাইবারের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম চালানোর চেস্টা করছে। জাতিগতভাবে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদকে পছন্দ করে না। একারণে আমরা খুব অল্প সময়ে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রনে আনতে সক্ষম হয়েছি। তাই বলে এটা নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগছি না। সাম্প্রতিক তালেবান ইস্যুতে রাষ্ট্রের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সমন্বয় করে জঙ্গিদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। আমরা সাইবার ওয়ার্ল্ডে খোঁজ খবর ও নজরদারি করছি। এটা নিয়ে আমরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছি।
২০০০ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে বোমা হামলার মধ্যদিয়ে জেএমবি’র কার্যক্রম শুরু করে। এরপর ময়মনসিংহে সিনেমা হলে বোমা বিস্ফোরণ, রাজশাহীতে প্রকাশ্যে জঙ্গি কার্যক্রম, গাজীপুরে আদালত প্রাঙ্গণে বোমা হামলা, ঝালকাঠিতে বিচারকদের ওপর বোমা হামলা, নেত্রকোনায় উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলাসহ ২০০৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি বিদেশি গণমাধ্যমে আলোচনা বিষয় স্থান করে নেয় জেএমবি’র জঙ্গি কার্যক্রম। জেএমবি’র কার্যক্রম যে একেবারে শেষ হয়ে গেছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। তবে এখন এই জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ ( জেএমবি) এই সংগঠনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের কার্যক্রম বিস্তার করার চেস্টা করছে। ইতিমধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের তথ্য মিলেছে। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খাগড়াগড়ে জেএমবি’র বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে তাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান জানান দেয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট ভারতের ব্যাঙ্গালুরু এলাকা থেকে জেএমবি’র দুর্ধর্ষ পলাতক জঙ্গি বোমারু মিজানকে গ্রেফতার করে ওই দেশের এনআইয়ে টিম। ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তানে কর্তব্যরত পুলিশের ওপর বোমা হামলায় ৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়। ওই বছরের ২৭ মে মালিবাগে পুলিশ ভ্যানে বোমা হামলায় একজন পথচারী আহত হয়। একই বছরের ২৩ জুলাই রাতে খামারবাড়ী ও পল্টন পুলিশ বক্সে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা দুইটি শক্তিশালী আইইডি যুক্ত বোমা ফেলে রেখে যায়।
সিরিজ বোমা হামলা : ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলার (মুন্সীগঞ্জ ব্যাতিত) ৪৩৪ স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিরা। একযোগে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ১৫৯ টি মামলা দায়ের হয়। হামলার ১৬ বছরের মধ্যে ১১৬ টি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। ৪৩ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে এসব মামলায় আসামি করা হয় এক হাজার ১৫৭ জনকে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার করা হয়েছে ৯৬৭ জনকে। ইতিমধ্যে রায় দেয়া ওইসব মামলায় ৩০৭ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। মৃত্যুদন্ড রায় দেয়া হয়েছে ২৭ জনকে।
ঢাকা মহানগর আদালত সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগর এলাকায় বোমা হামলার ঘটনায় ওই সময় ১৮ টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে তেজগাঁও ও বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা দু’টি মামলার রায় হয়ে গেছে। পুলিশ ৮টি মামলার চুড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বাকি ৮ টি মামলা বিচারাধীন পর্যায়ে আছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের কাজ চলছে। অনেক মামলায় আসামিদের নাম ও ঠিকানা কিছুই নেই বা ছিল না। সাক্ষীদেরও ঠিকমত পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সাক্ষী সাক্ষ্য দিতেও আসেন না। বেশির ভাগ সাক্ষীর ঠিকানাও পরির্বতন হয়েছে। এরকম নানা কারণে মামলা শেষ করতে সময় বেশি লেগে যাচ্ছে।